38 C
Dhaka
হোম সিরিজথ্রিলার সিরিজমতি মিয়ার ডায়রী। পর্ব ৪

মতি মিয়ার ডায়রী। পর্ব ৪

মিহির জাহেদে নীলের কবিতা এবং একটি খুনঃ

গতকাল রাতে মিহির জাহেদ স্যার নীলের কবিতা উপন্যাসটি পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।

ভোরে ঘুম ভাঙল মোবাইলের রিংটোনে। তীরন্দাজ মামা ফোন করেছে ভেবে ফোনটা ধরে কানে নিয়ে বললাম, হ্যালো মামা বলো, ওরহান পামুকের বই পেলে?
উত্তর এলো,
— আমি অবন্তিকা বলছি!
— ও আচ্ছা, বলুন।
— আপনি কি করে জানলেন আমি এতগুলো মানে প্রায় ৪০০ কবিতা মুখস্ত করেছি? আর আমার বিয়েও ঠিক হয়নি!
— তার আগে বলুন যে, রুদ্র কাকে খুন করেছে?
— ও মাই গড! আপনি এটা জানলেন কি করে?
— আপনি সময় করে বাসায় এসে বিস্তারিত বলতে পারেন আমাকে। যদিও আমি ঘটনার অধিকাংশই জানি।
— আচ্ছা আমি আজ স্কুল না করেই আপনার বাসায় আসবো।
— আমার এটা বাসা না, এটা ঘর। বাসা শুনলে খুব ছোট জায়গা মনে হয়। আর আপনি বিকেলে আসেন। শিক্ষিকা স্কুল ফাঁকি দিলে জাতির জন্যে উত্তম না। আমি ফোন রাখছি। অস্বস্তি এই যন্ত্র কানে রাখাটা!

এই বলে ফোনটা রেখে দিলাম। উঠে বাগানে গেলাম। ইশ! কতদিন পানি দেয়া হয় না। লিচু গাছটা ঝুঁকে পড়েছে। বেল গাছের গোড়া শুকিয়ে গেছে। ঘর থেকে পাইপ টেনে বাগানের মাটি ভিজিয়ে দিলাম। তারপর ঘরে গিয়ে শাওয়ার নিলাম।

কর্ণিয়া বিছানায় শুয়ে আছে। আমি ডাকতেই প্রথমে চোখ খুললো তারপর সোজা হয়ে লাফ দিয়ে বারান্দায় চলে গেলো। সে জানে বারান্দায় তার খাবার রেডি করে রেখেছি। গতকাল রাতে ডিনার করিনি। রন্ধন শিল্প আমার ধৈর্য্যে কুলায় না। শুধুমাত্র চা কফি বিনে।

চায়ের কাপে চুমুক দিতেই দরজায় নক।
ঠক ঠক! ঠক ঠক!!

— কে? কে?
— বলুনতো আমি কে?
— আপনি হলেন হা করা সূর্য্য এবং মাদার অফ সায়েন্স গণিতের সিনিয়র শিক্ষক। মেঘডুবি উচ্চ বিদ্যালয়ের। তা কি চাই।
— দরজাটা তো খুলুন।
— না। আমি জানি আপনি জ্বালাতন করতে এসেছেন।
— না ভাই জ্বালাবোনা। দুইটা কাজে এসেছি। এক গণিত আর দুই অবন্তিকা রুদ্র।

শুনেই আমি একটুও বিব্রত, অবাক কিচ্ছু হইনি। কারণ এই লোক অনেক বুদ্ধিমান, চালাক এবং জ্ঞানীও বটে। তবে ক্ষতিকর নয়। তাই দরজা খুললাম।

— কেমন আছেন গবেষক জ্ঞানচন্দ্র, জ্ঞানগর্ব, জ্ঞানাম্ভুদি, জ্ঞানচূড়ামণি?
— আমি শুধু গবেষক। এবং তা হীরক রাজার দেশের নয়। এদেশের, বাংলার।
— ওই হলো। যাহা বায়ান্ন তাহাই তিপান্ন চুয়ান্ন ছাপান্ন সাতান্ন…
— থামুন থামুন। চা বানিয়েছিলাম খাবো বলে, চুলোয় লিকার এখনো গরম আছে, আপনি খেলে আনতে পারি। খাবেন?
— আমি সর্বভূক। সাপ ব্যাংক কেঁচো তেলাপোকা কিছুতেই আপত্তি নাই। আর আপনি সাধছেন মামুলি চা। অবশ্যই খাবো, আলবাৎ খাবো।
— আপনি একটা কি বলবো.. থাক। এতো কথা বলেন কেন? চা আনছি।

আমি আরেক কাপ চা বানিয়ে হাসান মাস্টারের হাতে দিলাম।

— তা হা করা সূর্য্য সাহেব। আপনার দুটো কারণ শুনি!
— এক নাম্বার হলো, ম্যাট্রিক্স ও ক্যালকুলাসের একটা জটিল হিসেব। আর দুই নাম্বার হলো রুদ্র খুন করেছে, এই ব্যাপারে। যে কোন একটা বলবো আজ। বলুন কোনটা বলবো?

আমি জানি যে রুদ্র খুন করেছে। কিন্তু কেন, কাকে, কিভাবে খুন করেছে তা জানি না। এবং এসব নিয়ে হাসান মাস্টারের সাথে আলাপও করতে চাই আপাতত। তাই রুদ্রের খুন করার ব্যাপারে কোন প্রকার আগ্রহ না দেখিয়ে বললাম, আজ তবে গণিতের বাতিই জ্বলুক এ ঘরে।

— গবেষক সাহেব! আপনি অনেক বুদ্ধিমান। প্রায় আমার দশগুণ বেশি। আসুন আমরা গণিতে বসি।

ম্যাট্রিক্স আর ক্যালকুলাসের গল্প হলো প্রায় ২ ঘন্টা ধরে। তারপর কালো সোফা থেকে উঠতে উঠতে হাসান সাহেব বললো, এতকিছু জেনেও কোন সমাধান করছেন না কেন?

— কি জানি আমি?
— রুদ্র খুন করার ব্যাপারটা!
— এসব নিয়ে আরেকদিন গল্প হবে। এবার আপনি স্কুলে যান। সময় হয়ে এলো। ভাগেন।
— আপনাকে মাঝে মাঝে পৃথিবীর সবচেয়ে বদ লোক মনে হয়। এমন ব্যবহার করেন কেন?

এ বলে হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন হাসান মাস্টার।

ঠিক দুই মিনিট পর কলিং বেল বেজে উঠলো। কে টে জিজ্ঞেস না করে দরজা খুললাম। আজ জাম রঙের শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে অবন্তিকা।

— আসুন ভেতরে। আমি অপেক্ষা করছি আপনার জন্যেই।

অবন্তিকা ঘরে ঢুকে সাদা সোফায় বসলো। আমি বসলাম কালো সোফায়। আমার হাতের ডান পাশের দেয়ালে একটা ছবি ঝুলছে! মোনালিসার ছবি। অবন্তিকার চেহারা অবস্থা অনেকটা মোনালিসার মত দেখাচ্ছে। হাসি, কান্না, বিষাদ, ক্ষোভ, মায়া সবকিছুর মিশ্রণ। চারিদিক শান্ত, কোথাও কোন শব্দ নেই। নীরবতা ভেঙে আমি বললাম,
— চা খাবেন?
— না! চিনি ছাড়া কফি খাবো।
— আজ আমার চা দিবস। সারাদি শুধু চা খাবো। কফি হবে না।
— আপনি আসলে কি বলেন তো। ফালতু একটা লোক। আচ্ছা আমি চা’ইই খাবো।
— এখনতো আপনাকে চা খাওয়াতেও ইচ্ছে করছে না। যান নিজে বানিয়্র খান।

অবন্তিকা রাগান্বিত চেহারা নিয়ে রান্না ঘরে গেল। আসার সময় এক হাতে এক কাপ চা আর অন্যহাতে কর্ণিয়াকে নিয়ে আসলো।

সোফায় বসতে বসতে অবন্তিকা বললো,
— আপনি কি করে সব জানলেন বলুনতো!
— তার আগে আমাকে বলুন রুদ্র কাকে খুন করেছে?
— আপনি খুনের ব্যাপারটাও জানেন! আপনি কোন এজন্সির লোক নাকি?
— না! আমি মেট্রিক পাশ গবেষক। এবার সোজা সাপ্টা করে বলুনতো পুরো ব্যাপারটা! বিশেষ করে রুদ্র কাকে খুন করেছে? কেন করেছে তা আমি জানি।
— আমার ইচ্ছে করছে না। চলুন সেদিনের কফি শপে যাই।
— না! বললাম তো আজ আমার চা দিবস।
— আচ্ছা। তাহলে আমি স্কুলে যাই।
আমি নূন্যতম আগ্রহ না দেখিয়ে বললাম, ঠিক আছে
বিদায়।
দরজা পর্যন্ত গিয়ে অবন্তিকা আবার ফিরে এলো।
— আচ্ছা বলুন না আপনি কি করে সব জানেন?
— প্রথমে কিছুই জানতাম না। আপনি আপনার বাবার নাম আমাকে বলার পর থেকে সব জানি।
— কি করে?
— আপনি বোধহয় আপনার বাবার খেয়াল রাখেন না।
— হুম! বাবার সবকিছু আমার ছোট বোন বিউটি সামলায়। তাতে কি?
— আপনার বাবার শেষ লেখা বইটির নাম নীলের কবিতা। যেটা এ বছরের মাঝামাঝি প্রকাশিত হয়েছে। আপনার আর রুদ্রের সবকিছুই সেখানে বলা আছে ভিন্ন নামে। আপনি বোধহয় বইটি পড়েননি।

ওহ আমি গড, বলতে বলতে অবন্তিকা গা ছেড়ে সোফায় বসে পড়ে। তারপর
— কি লিখেছে সে বইয়ে।
— লিখেছে একটি ছেলে অর্থাৎ রুদ্র একটি মেয়েকে মানে আপনাকে খুব পছন্দ করে। রুদ্র আপনার বাবার খুব প্রিয় ছাত্র। তারপর একদিন ছেলেটি মেয়েটিকে অন্য একটি ছেলের সাথে কথা বলতে দেখে খুব ক্ষেপে যায়। এবং একটি দুর্ঘটনা বঃশত রুদ্র ওই ছেলেটিকে মেরে ফেলে। আপনাকে চিনে গেছি, রুদ্রকেও। কিন্তু খুন হওয়া ছেলেটিকে চিনতে পারছি না। রুদ্র নিজেক খুব অনুতপ্ত জানি। রুদ্র কোথায় আছে এখন?
— আমাকে আপনি বাঁচান প্লিজ।
মুচকি হেসে বললাম, কিভাবে? আমি তো গবেষক। তাও আবার মেট্রিক পাশ গবেষক।
— গবেষণা করেই আমার বাঁচার উপায় বের করে দিন।
— আর আমার ফি?
— কত চাই আপনার?
— মোট দু লাখ! এক লাখ এডভান্স।

বলতেই অবন্তিকা ব্যাগ থেকে চেক বের করে লিখে আমার হাতে দিয়ে বললো, এখানে দু লাখই আছে। প্রয়োজনে আরো দিবো।

— ইশ! কম চেয়ে ফেললাম। তাই না! ফি টা আরো বেশী চাইলে বেশী দিতেন।
— হুম! কিন্তু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে বাঁচান, উদ্ধার করুন।
— আপনি নিশ্চিন্তে স্কুলে যান। স্কুলে জ্ঞান দান শেষে বিকেলে আসবেন, একসাথে চা খেতে যাবো এক জায়গায়।
— কোথায়?
— ভয় নেই! কিডন্যাপ করবো না।
— আপনি কিডন্যাপ করলে আমি তাতেও রাজি।
— তাই নাকি! তাহলে কিডন্যাপ করবো। আর শুনুন, সন্ধ্যা ৭ঃ১৫ তে রুদ্রকে আমার সাথে দেখা করতে বলবেন। আমার ফোন নাম্বার তাকে ভুলেও দিবেন না। আমার ঘরে আসতে বলবেন। ঠিক আছে?
— আচ্ছা!
— এবার ঘর থেকে বেরিয়ে স্কুলে পালিয়ে যান। বিকেলে চলে আসবেন। আর চেকটার তারিখ কবেকার?
— আজকের।
— যাক তাহলে বেশ কিছু বই কেনা যাবে। আপনি এখনো বসে আছেন কেন? যান, বের হন। টিচার হয়েও স্কুল ফাঁকি দিবেন!

অবন্তিকা জাম রঙের শাড়ি পরে নীল গাড়িতে চড়ে চলে গেলো।
আমি পড়ার ঘরে গিয়ে, এলাইন লিওনার্দোর লেখা, দ্যা হিউমেন সাইকোলজি & ক্রিমিনোলজি উইথ এ মার্ডার বইটা খুঁজে পড়তে বসলাম। পঞ্চম বারের মত বইটা পড়বো। বইয়ের মলাটে অবন্তিকার হাসিমুখ ভাসছে কেন? নাহ! আমি তো অবন্তিকার প্রণয়ে হাত পা মাথা কিছুই রাখিনি! সম্ভবও না। তাহলে তার মুখ কেন ভাসছে? জাম রঙের শাড়ি পড়েছে বলে? তা কেন হবে।
অনেক আবোল তাবোল হয়েছে বাপু প্রায় দুপুর হয়ে যাচ্ছে। বইটা যতদূর পারি পড়তে হবে।

বইটা পড়া শুরু করলাম। কর্ণিয়া আমার সামনে এসে লেজ নাড়াচ্ছে। তাকে কোলে নিয়ে পড়া শুরু করলাম।

বিকেল আর সন্ধ্যা কি হয় তা ডায়েরীতে রাতে লিখতে হবে। মনে হচ্ছে খুব অদ্ভুত কিছু হবে। অবন্তিকাকে পড়ছি না, পড়ছি এলাইন লিওনার্দোর বই।

মতি মিয়া, ৭ অক্টোবর ২০১৯।

হাসান জামান
হাসান জামান
কলেজ জীবনে ২০০৫ সাল থেকে কবিতা আর ছোটগল্প লেখার মধ্য দিয়ে সাহিত্যে পদার্পণ তরুণ লেখক হাসান জামান-এর৷ তারপর জাতীয় দৈনিকসহ লিখেছেন অনেক লিটল ম্যাগজিন-এ৷ এক সময় সম্পাদনা করেছেন এক সময়কার জনপ্রিয় লিটল ম্যাগাজিন "অর্বাচীন" ও "শব্দঘর"৷ পেশায় সফটওয়্যার নির্মাতা ও তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক পরামর্শক হলেও সাহিত্যের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেননি৷ সুযোগ পেলেই সাদা জমিনে কলমের আঁচড়ে সাহিত্য রচনার চেষ্টা করেন অবিরত৷
একইমত আর্টিকেল

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
অনুগ্রহ করে এখানে আপনার নাম লিখুন

- Advertisment -
Digital Marketer Apple Mahmud Riyad

জনপ্রিয়

মন্তব্য